
সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে গেছে মেরুদণ্ড। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না, এমনকি ৪ বছর ধরে হাঁটতেও পারছেন না ৩০ বছরের হাসান সরদার। হারিয়েছেন গার্মেন্টন্সের চাকরিও। অন্যের সহযোগিতায় করেন চলাফেরা। তবুও থেমে নেই জীবনযাত্রা, বাদাম বিক্রির অর্থে চলছে পরিবার।
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার কাজীবাকাই ইউনিয়নের পশ্চিম মাইজপাড়া গ্রামে বসবাস অসহায় হাসানের পরিবারের। ইচ্ছাশক্তি আর মনবল থাকলে কোনো বাঁধাই আটকে রাখা যায় না, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩০ বছরের হাসান। মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তি না করে মাসে আয় করছেন ৫-৬ হাজার টাকা। এতে সংসার চালানো অনেকটাই কষ্টদায়ক।
তবু ভোর হলেই প্রতিদিন মা হামিদা বেগম তার বড় ছেলে হাসানকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে জামাকাপড় পরিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দেন। পরে শুরু হয় নিত্যদিনের কার্যক্রম।
জানা গেছে, ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে ট্রাক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন হাসান। দেশে চিকিৎসা করিয়ে ৮ লাখ টাকা দেনা হাসানের পরিবারের। ভিটেমাটিও বন্ধক রাখা ব্যাংকের কাছে। তবুও থেমে নেই অসহায় মানুষটির পথচলা। বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে প্রতিদিন সকালেই বেরিয়ে পড়েন হুইল চেয়ার নিয়ে।
ভিক্ষাবৃত্তি না করে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাটবাজার ও স্কুল-কলেজের সামনে বিক্রি করেন চানাচুর, বাদাম, চিপস্ ও আঁচারসহ শিশুদের খাবার। ৪ বছর ধরে হাসানের জীবনের গল্প চলছে এভাবেই।
পরিবার জানায়, সংসারে মা-বাবা ও ছোট এক ভাই আছে হাসানের। বাবা আব্দুল গণি সরদার প্রতিবন্ধী হওয়ায় ভারি কাজ করতে পারেন না। মা হামিদা বেগম শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বাড়ির বাইরেও বের হন না তেমন। সড়ক দুর্ঘটনার পর হাসানের মেরুদণ্ড ভাঙায় বন্ধ হয়ে যায় ছোট ভাই হাদিস আহম্মেদের পড়ালেখা। এইচএসসি পাস করা হাদিসের অপেক্ষা এখন একটি চাকরির। তাও জুটছে না কপালে।
ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় না গিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা হাসানের এমন কর্মকাণ্ডে খুশি স্থানীয়রা। তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।
সরকারের কাছে এলাকাবাসীর দাবি, অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর। হাসানকে বিদেশে চিকিৎসা করানো গেলে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে সে। এজন্য প্রয়োজন ৩০-৩৫ লাখ টাকা। এতো টাকার জোগান দেয়া অসহায় পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ী সরোয়ার ফরাজী বলেন, ‘হাসান আমার দোকান থেকে বাকিতে পাইকারি মালামাল নেয়। পরে বিক্রি করে টাকা দেয়। ওর পরিবার অসহায় হওয়ায় কোনোমতে টিকে আছে। একটা জিনিস ভালো লাগে, হাসানের মেরুদণ্ড ভেঙে গেলেও সে ভিক্ষা করে না। এজন্য হাসান স্যালুট পাওয়ার যোগ্য।’
স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আকন বলেন, ‘হাসানের পরিবারকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হোক। এছাড়া সমাজের ধনী ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে পরিবারটিতে সচ্ছলতা ফিরবে। আমরা এলাকাবাসী এটাই প্রত্যাশা করি।’
হাসান সরদার বলেন, ‘আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। দেশে চিকিৎসা করিয়ে এখন লাখ লাখ টাকা দেনা। পরিবারের আর কোনো সামর্থ্য নেই, সবকিছু খুইয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন মা-বাবা। সরকারি আর ব্যক্তি পর্যায়ে সহযোগিতা পেলে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব। মানুষের কাছে হাত না পেতে, কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। অভাবের সংসার এখন কষ্টে ভরা। এর থেকে আদৌ মুক্তি পাবো কিনা, সেটা জানি না।’
হাসানের বাবা আব্দুল গণি সরদার বলেন, ‘আমি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। একটি চোখ অচল, আরেকটি চোখে কম দেখি। ভারি কোনো কাজ করতে পারি না। বড় ছেলে গার্মেন্টসে চাকরি করতো, দুর্ঘটনায় তার চাকরিও চলে গেছে। ছোট ছেলের পড়ালেখাও বন্ধ। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দিকে তাকানোর আর কেউ নেই। ছোট ছেলের একটি চাকরি হলেও বেঁচে থাকতে পারতাম।’
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, ‘সবার আগে হাসান কিংবা তার পরিবার থেকে উপজেলা প্রশাসন বা জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। পরে খোঁজখবর নিয়ে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি অন্যকোনো সহযোগিতা করা যায় কিনা সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া চিকিৎসার কাগজপত্রসহ সমাজসেবা অধিদফতরেও হাসানের পরিবার যোগাযোগ করতে পারে। সেখান থেকে ভাল একটা সাপোর্ট পাওয়া যেতে পারে।’
